মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

গ্রাম আদালত

রাম সরকার কি?
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার প্রথম ধাপ হলো গ্রাম সরকার। গ্রাম সরকার দেশের প্রত্যেক ইউনিয়নের নয়টি ওয়ার্ডে প্রতিষ্ঠিত হবে। একজন গ্রাম সরকার প্রধান, একজন উপদেষ্টা ও ১৩ জন সদস্য (মোট ১৫ জন) নিয়ে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা গঠিত হবে। প্রত্যেক ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য গ্রাম সরকারের প্রধান ইউনিয়ন পরিষদের সংশ্লিষ্ট মহিলা সদস্য হবেন গ্রাম সরকারের উপদেষ্টা। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত মেম্বার পদাধিকার বলে গ্রাম সরকারের প্রধান নির্বাচিত হন। স্থানীয় পর্যায়ে সরকার প্রশাসনকে শক্তিশালী ও গতিশীল করার লক্ষ্যে গ্রাম সরকারের ভূমিকা অপরিসীম। এই গ্রাম সরকারের অন্যতম একটি উদ্দেশ্য হলো গ্রামের মানুষদের আইনগত সেবা প্রদান। সেই লক্ষ্যে বিচার কাজ সম্পন্ন করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গ্রাম আদালত। নিচে আমরা গ্রাম আদালত সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।


গ্রাম আদালতের উদ্দেশ্য
পল্লীগ্রামে অধিকার বঞ্চিত আপামর জনগণের ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭৬ সালে গ্রাম আদালত গঠিত হয়েছে। গ্রাম আদালত গ্রামের মানুষের সবচাইতে কাছের আইনগত প্রতিকার পাবার আশ্রয়স্থল। কম খরচে কম সময়ে গ্রাম পর্যায়ে ছোটখাটো অপরাধের বিচারকার্য নিস্পত্তির জন্যই গ্রাম আদালত। গ্রাম আদালত অধ্যাদেশ ১৯৭৬ অনুযায়ী গ্রাম আদালতের যাবতীয় কার্যক্রম প্ররিচালিত হয়।


গ্রাম আদালত গঠন
গ্রাম আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান এবং বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষে দু 'জন করে প্রতিনিধি নিয়ে অর্থাত্ মোট ৫ জন সদস্য নিয়ে গ্রাম আদালত গঠিত হয়। উভয়পক্ষের মনোনীত দু 'জন বিচারকের মধ্যে একজনকে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হতে হয়। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। যদি কোনও কারনে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনে অপারগ হন অথবা তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে তাহলে থানা নির্বাহী কর্মকর্তা ইউনিয়ন পরিষদের অন্য কোনও সদস্যকে (যাকে কোনও পক্ষ মনোনীত করেনি) গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান মনোনীত করেন। যদি কোনও পক্ষ ইউনিয়ন পরিষদের কোনও সদস্যকে পক্ষপাতিত্বের কারণে মনোনীত করতে না পারেন তাহলে চেয়ারম্যানের অনুমতিক্রমে অন্য কোনও ব্যক্তিকে গ্রাম আদালতের সদস্য করা যাবে.

গ্রাম আদালতের এখতিয়ার
গ্রাম আদালত অধ্যাদেশ ১৯৭৬ অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদ গ্রাম আদালতে ফৌজিদারী ও দেওয়ানী এ দু 'প্রকার মামলার বিচার হতে পারে।

ফৌজদারী বিষয়সমূহ
বেআইনী জনতার সদস্য হওয়া বা দাঙ্গা  - হাঙ্গামায় লিপ্ত (বে - আইনী) জনতার সদস্য সংখ্যা ১০ বা তার কম হতে হবে (ধারা ১৪৩ ও ১৪৭ দঃ বিঃ), সাধারণ আঘাত, অপরাধজনক অনধিকার প্রবেশ, ক্ষতিকারক কাজ, ক্ষতির পরিমাণ সর্বোচ্চ ৫০০০ টাকা (ধারা ৩১২, ৪২৭ ও ৪৪৭ দঃ বিঃ) হাতাহা তি, বে - আইনি অবরোধ, অবৈধ শক্তি প্রয়োগ, অবৈধ ভয়ভীতি প্রদর্শন, মাদকাসক্তি, ইঙ্গিতের মাধ্যমে নারীর শ্লীলতাহানি ইত্যাদি (ধারা ১৬, ৩৩৪, ৩৪১, ৩৪২, ৩৫৮, ৫০৪ (১ম ভাগ ), ৫০৮, ৫০৯ ও ৫১০ দঃ বিঃ);
সকল ধরনের চুরি (চুরিকৃত মূল্যের পরিমাণ ৫০০০ টাকা বা তার কম হলে (ধারা ৪৭৯ ৩৮৫ ও ৩৮১ দঃ বিঃ)
অস্থাবর সম্পদ আত্ম সাত §, বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা, দলিলাদির ধ্বংস সাধন (ধারা ৪০৩, ৪০৬, ৪১৭ ও ৪২০ দঃ বিঃ).

দেওয়ানী বিষয়সমূহ
§ চুরির টাকা আদায়ের মামলা
অস্থাবর সম্পত্তি উদ্ধার বা তার মূল্য আদাযের মামলা §
দখল হারানোর এক বছরের মধ্যে স্থাবর সম্পত্তি দখল উদ্ধারের মামলা §
§ ধ্বংসকৃত অস্থায়ী জিনিসপত্রের ক্ষতিপূরন আদায় সংক্রান্ত মামলা
§ গবাদি পশুর অনধিকার প্রবেশের জন্য খেসারতের মামলা
কতগুলো ক্ষেত্রে গ্রাম আদালত বিচারকার্য পরিচালনা করতে পারে না, যেমন § -
- অভিযুক্ত ব্যক্তি পূর্বে যদি কোনও উচ্চতর আদালত কর্তৃক দন্ডিত হয়ে থাকে
- যদি অপ্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির সম্পত্তি জড়িত থাকে
- বিদ্যমান কলহের ব্যাপারে কোনও সালিসের ব্যবস্থা করা হলে
- সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা কার্যরত কোনও সরকারী কর্মচারীর পক্ষ হয়ে থাকলে.

অনেকে গ্রাম আদালত এবং সালিসী ব্যবস্থাকে এক করে ফেলে. গ্রাম আদালত এবং সালিসী ব্যবস্থা দু 'টি ভিন্ন জিনিস. গ্রাম আদালতে দেওয়ানী এবং ফৌজদারী দুই ধরনের বিচার করার ক্ষমতা রয়েছে. কিন্তু সালিসী ব্যবস্থায় শুধুমাত্র পারিবারিক সমস্যার (যেমন - ভরণপোষন, দেনমোহর, বহুবিবাহ ইত্যাদি) সমাধান করা হয়. সালিসী ব্যবস্থা যে কোন ব্যক্তি বা যে কোন সংস্থা করতে পারে।

: -: সালিসী ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন: -:


কোর্ট ফি:
গ্রাম আদালত অধ্যাদেশ অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নিকট মামলার আবেদন পত্র দায়ের করতে হবে। ফৌজদারী মামলা হলে দু 'টাকার এবং দেওয়ানী মামলা হলে চার টাকা ফি লাগবে। দরখাস্তের সাথে ফি প্রদানের রসিদ দাখিল করতে হবে।


গ্রাম আদালতের স্থান নির্বাচন
যে ইউনিয়নে এলাকার অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সে ইউনিয়নে গ্রাম আদালত গঠিত হয়। একটি ইউনিয়ন এলাকায় অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কিন্তু বিবাদী অন্য ইউনিয়নের হলে স্ব - স্ব ইউনিয়ন হতে সদস্য মনোনয়ন দিতে পারেন।


গ্রাম আদালতের ক্ষমতা
গ্রাম আদালত সর্বোচ্চ ৫০০০ টাকা ক্ষতিপূরণ আদায়ের মামলা করতে পারে. দু 'টি ক্ষেত্রে গ্রাম আদালত জরিমানা করতে পারে
প্রথমতঃ গ্রাম আদালত অবমাননার দায়ে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা জরিমানা।
দ্বিতীয়তঃ রাষ্ট্রীয় গোপনীয় নয় এমন দলিল দাখিল করতে অস্বীকার বা সমন দিতে অস্বীকার করলে সর্বোচ্চ ২৫০ টাকা জরিমানা করতে পারে।

গ্রাম আদালতের কার্যপদ্ধতি
গ্রাম আদালত কর্তৃক বিচারযোগ্য দেওয়ানী মামলার ক্ষেত্রে 4 টাকা ও ফৌজদারী মামলার ক্ষেত্রে ২ টাকা ফি দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নিকট বিচার প্রার্থী আবেদন করতে পারে. আবেদনপত্রে নিম্নে বর্ণিত বিবরণাদি থাকতে হবে:
ইউনিয়ন পরিষদের নাম §
§ আবেদনকারীর নাম ও ঠিকানা
§ বিবাদীর নাম ও ঠিকানা
ইউনিয়ন পরিষদের নাম, যেখানে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে
সংক্ষিপ্ত বিবরণ সালিশের ।



গ্রাম আদালতের বিচার পদ্ধতি:
আবেদনপত্র গৃহীত হলে তা ১ নম্বর ফরমে লিপিবদ্ধ করতে হয়. অভিযোগ অমূলক মনে হলে চেয়ারম্যান আবেদন নাকচ করে দিতে পারেন. নাকচের আদেশ অন্যায়ভাবে করা হলে বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি ৩০ দিনের মধ্যে সহকারী জজ / ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট পুনঃবিবেচনার জন্য আবেদন করতে পারেন।
আবেদন গৃহীত হলে নির্দিষ্ট তারিখ ও সময়ে বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষকে উপস্থিত হতে চেয়ারম্যান সমন দেবেন। সমন ব্যক্তিগতভাবে জারি করতে হবে, সমনের উল্টো পৃষ্ঠায় সমন প্রাপকের প্রাপ্তি সূচক স্বাক্ষর নিতে হবে। বিবাদীকে পাওয়া না গেলে সমনের এক প্রস্থ তার বাড়ির প্রকাশ্য স্থানে টানিয়ে দিতে হবে এবং তাতে সমন জারি হয়েছে বলে গণ্য হবে।
সমন জারি এক সপ্তাহের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বাদী এবং বিবাদী উভয় পক্ষকে তাদের সদস্য মনোনীত করতে বলবেন এবং মনোনীত সদস্য নিয়ে আদালত গঠিত হবে । আদালত গঠিত হওয়ার ৩ দিনের মধ্যে প্রতিপক্ষকে লিখিত আপত্তি দাখিল করতে বলবেন। লিখিত না দিলে মৌখিকভাবে বলতে বা তা লিপিবদ্ধ করতে হবে. নির্দষ্ট দিনে আদালত বিচারে বসবে. শুনানি ৭ দিনের বেশি স্থগিত রাখা যাবে না।
আবেদনকারী নির্ধারিত তারিখে হাজির হতে ব্যর্থ হলে চেয়ারম্যান যদি মনে করেন আবেদনকারী অবহেলা করছে তাহলে তিনি আবেদন নাকচ করতে পারেন ।
নাকচের 10 দিনের মধ্যে পুনঃবহাল করে মামলার তারিখ নির্দিষ্ট করবেন ।
অনুরূপভাবে বিবাদী অবহেলা করে অনুপস্থিত থাকলে চেয়ারম্যান মামলার শুনানি নিষ্পত্তি করবেন। এক্ষেত্রে ১০ দিনের মধ্যে বিবাদী আবেদন করলে মামলাটি পুনঃবহাল করে শুনানির জন্য তারিখ ধার্য করবেন।


গ্রাম আদালতের সিদ্ধান্ত
গ্রাম আদালতের রায় প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে হবে। সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত বা চার পঞ্চমাংশ ভোটে গৃহীত হলে তার বিরুদ্ধে আপীল করা যাবে না। যদি দুই - তৃতীয়াংশ ভোটে সিদ্ধান্ত হয়, তার বিরুদ্ধে আপীল করা যাবে। সিদ্ধান্ত ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে যে কোনও পক্ষ ফৌজদারী মামলার ক্ষেত্রে থানা ম্যাজিস্ট্রেট এবং দেওয়ানী মামলার মামলার ক্ষেত্রে সহকারী জজ (মুন্সেফ) এর আদালতে আপীল করতে পারবেন।